দেশের অহংকার সোনালি আঁশ

কেমন যাচ্ছে তার চাষাবাদ? কেমন হচ্ছে তার রপ্তানি? তার থেকে কতটুকু মুনাফা পাচ্ছে দেশ? কতটুকুই বা লাভবান হচ্ছে দেশের কৃষক? এমন প্রশ্নগুলো কি কারো মনে আনাগোনা করে আজকের প্লাষ্টিক দুনিয়ায়!
আমি আজ আপনাদের সামনে তারই কিছু তথ্য উপাত্ত উদঘাটন করার চেষ্টা করবো। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এদেশের ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রান ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় আমাদের বাংলাদেশ। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত একটি দেশ সাধারনত মুখ থুবরে পড়ে থাকে বছরের পর বছর, স্হিতি ফেরাতে সরকার ও জনগনকে ঐক্যবদ্ধ থেকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নে। বাংলাদেশর বেলায়ও তার কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। কৃষি,শিল্প, কল কারখানা সব জায়গায় বেড়ে যায় পুনর্গঠনের স্পৃহা! পাকিস্তানী শাষকদের রক্তচক্ষুর রোষানলে দেশের যতটুকু কল কারখানা ছিল তাও একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয়েছিলো। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ পুনঃ গঠনের ঐ মুহুর্তে সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলা বাংলার কৃষক অদম্য শক্তিতে মাঠে সোনার ফসল ফলিয়ে দেশের খাদ্য ঘাটতি কমাতে যেমন রেখেছিলো বড় ভুমিকা, তেমনি সোনালি আঁশ পাট চাষ করে বৈদেশিক মুদ্রা আনতে রেখেছিলো সবচেয়ে বড় ভুমিকা ।
আমরা বইয়ের পাতায় পড়তে পড়তে একটা বিষয় মুখস্হ বলি যে ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ , আজ বিংশ শতাব্দির বিংশ বর্ষের মাঝামাঝি দাড়িয়ে স্যাটেলাইট আর ডিজিটাল নামক শব্দে রপ্ত হয়ে , শিল্প কারখানার অভুতপুর্ব উন্নয়নে, পোষাক রপ্তানি ও জনশক্তি রপ্তানিকৃত রেমিটেন্সের হিসেব নিকেশের ধুম্রজালে ভুলতেই বসেছি, কখন কোন ঋতু আসছে আর যাচ্ছে। নেই , আজ নেই, ছয়টি ঋতুর বিষদন্ত না বলেই শুধু বর্তমান চলছে যে গ্রিষ্ম ঋতু তার দিকেই সামান্য আলোকপাত করতে পারি । যেহেতু দেশের অদ্যাবধি প্রধান অর্ধকরী ফসল সোনালি আঁশ পাট চাষের চলছে করুন পরিনতি। বসন্তের বিদায়ের পরেই বৈশাখের প্রারম্ভে প্রথম বৃষ্টিতেই কৃষক হাসিমুখে পাটের বীজ ছিটিয়ে আসে তার খেতে, প্রয়োজন মত বৃষ্টি পায়, পাটের গাছ গজায়, কুষক আগাছা পরিস্কার করে মাথা উচু করে দাড়াতে শুরু করে পাট গাছ তার আপন মহিমায় ! কখনো রোদ কখনো বৃষ্টি এ যেন ফসলের সাথে প্রকৃতির এক সখ্যতা,, কি মিল দুইয়ের মাঝে । পাট বড় হয়ে তার পরিপক্কতা আসতেই বর্ষা ঋতুর আগমন ঘটে আষাঢের বর্ষণ দিয়ে, মাঠে ঘাটে চারদিকে পানি থৈথৈ করে, যথারীতি কৃষক তার পাট কেটে জাগানি দিতে শুরু করে নিজ খেতে অথবা স্বল্প দুরে কোন জলাসয়ে । তারপর অর্ধপচা পানিতে দাড়িয়ে কৃষক পাটে আঁশ এড়িয়ে নিয়ে আসে বাড়ির আঙিনায় । কিষাণীর কাজ বেড়ে যায় বহুগুনে, তবুও মুখে প্রশান্তির হাসি নিয়ে পাট শুকাতে ব্যস্ত যেন কি এক নতুন স্বপ্ন সুখে ।
এতক্ষণ পাট চাষের যে কাহিনী চয়ন করলাম তা আজ শুধুই অতীতস্মৃতি । আজ নেই পাট আর প্রকৃতির সেই সখ্যতা, চাইলেও কৃষক পাচ্ছে না পাটের সঠিক সময়ে সেচ দিতে , মাঠে ঘাটে পানির অভাবে কৃষক পারছে না পাটের জাগানি দিতে । কারণ একটাই ,তা হলো জলবায়ুর পরিবর্তনীয় চরিত্রগত আচরন। আপনারা একবার ভেবে দেখুন , যে পাট উৎপাদনে আশির দশকে যে ব্যয় হতো তার চেয়ে বহুলাংশ খরচে বেড়েছে বিংশ শতাব্দীপূর্ব থেকেই ! একসময় পাটে কোন প্রকার সেচ দেওয়া ছিলো উচ্চাভিলাষী কৃষকের কাজ , ইদানীং সেই পাটেই সেচ ছাড়া কোনভাবে চাষ সম্ভব হচ্ছে না, বাকি সার কীটনাশক তো আছেই ।

কৃষিতে হয়তো কাগুজে ভদ্রলোক মানুস হয়ে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই, কিন্তু এবছরের অনাবৃষ্টিতে পাট চাষের স্বচিত্র দর্শন করে আমি শুধু মর্মাহতই না, শঙ্কিত ও বটে । কারন আধুনিক চাষাবাদ করতে যেখানে লাঙ্গলের পরিবর্তে পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের সাথে সেচ প্রদান একটি অত্যাবশ্যকীয় বিনিয়োগ, সেখানে এবার কৃষক সেচের পানিটাও উত্তোলন করতে গিয়ে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে ! তার কারনও ঐ জলবায়র পরিবর্তন ।

আমি আপনাদের সামনে আমার নিজ জেলার মাঠগুলোর জ্বলন্ত উদাহারন আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি ! একটা মাঠে যতগুলো নলকুপ আছে কুষকের সেচ চাহিদা মেটানোর জন্য তার বেশির ভাগই একশো কুড়ি ফুটের বেশি গভীর , অথচ সেসব নলকুপের কোনটাতেই চাহিদানুযায়া পানি উত্তোলন করা যাচ্ছে না, কারন পানির লেযার অনেক গভীরে নেমে গিয়েছে ! ফলশ্রুতিতে খাঁখাঁ করছে আজ কৃষকের পাট খেত !


বৃষ্টির বালাই নেই, সেচ পাম্পে পানি উঠে না , মাটি ফেটে চৌচির শিশু পাট অকালেই শুকিয়ে মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে ! কিছু কিছু কৃষক হয়তো অত্যাধুনিক প্রযৃক্তির জলমটর গভীর নলকুপে সংযোগ করে পাটের ফলন স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখতে সক্ষম হলেও বাকিরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে পাট চাষের । এর সাথে সামনে রয়েছে জাগানির মত পানি সংশ্লিষ্ট আরো অনেক ঝামেলা । এমতাবস্থায় স্বাভাবিক বিনিয়োগ অপেক্ষা যদি পাঁচ ছয়গুন বেশি বিনিয়োগ করে বাজারে যদি পাঁচ ছয়গুন বেশি দাম না পায় তাহলে কি কৃষক পাট চাষে ভবিষ্যৎকালে উদ্ভুদ্ধ হবে? এখানে প্রশ্ন থেকে যায় । ইতিমধ্যে অনেকাংশে পাট চাষ কমেই আসছে । উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগছে , সোনালি আঁশ পাট চাষ কি সত্যি বিলুপ্ত হবার পথ ধরবে? একদিকে পাট চাষে বিনিয়োগ বাড়ছে লাগামহীন ভাবে অন্যদিকে আধুনিতার ছোয়ায় অতিমাত্রায় পলিথিনের ব্যবহারে অপমানিত ও অবহেলিত হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব পাটজাতদ্রব্য । কে শুনবে, কে মানবে, কে ব্যবস্থা নেবে জানি না, আমার কথা একটাই, পাট বাঁচান পরিবেশ বাঁচান।

চৌধুরী মাহফুজুল কবির (জুয়েল)

One thought on “দেশের অহংকার সোনালি আঁশ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *