প্রকাশ্যে টিকা নেবেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো নির্বাচন নিয়েই মেতে আছেন। ভোটে কারচুপির ভিত্তিহীন অভিযোগের বুলি আওড়েই যাচ্ছেন। তিনি যখন এসব নিয়ে ব্যস্ত, তখন দিনে দিনে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে তাঁর দেশের করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্বের এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছেন দেশটির সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামা। করোনার যে টিকা সরকারের অনুমোদন পাবে, সেটির প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করতে তাঁরা ক্যামেরার সামনে ওই টিকা নেবেন বলে জানা গেছে।

এর আগে দল-মত ভুলে সাবেক প্রেসিডেন্টরা সর্বশেষ এককাতারে দাঁড়িয়েছিলেন ২০১৭ সালে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহে সেবার সাবেক চার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, বিল ক্লিনটন, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর ছেলে জর্জ ডব্লিউ বুশ এক মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন। এর আগে ২০০৪ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সুনামির পর একসঙ্গে কাজ করেছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, গত বুধবার দেশটিতে এক দিনে করোনায় মারা গেছেন ৩ হাজার ১৫৭ জন। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পৌনে তিন লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল করোনা। সব মিলিয়ে দেশটিতে করোনা সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি।

এমন পরিস্থিতিতেও মহামারি মোকাবিলা নিয়ে নীরব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সমালোচকেরা বলেছেন, তিনি আত্মপ্রশংসা আর কৃতিত্ব নিতেই বেশি আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সিডিসির পরিচালক রবার্ট রেডফিল্ড বুধবার বলেছেন, ‘বাস্তবতা হলো ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি খুব কঠিন সময় হতে যাচ্ছে। আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে এই তিন মাস কঠিনতম সময় হতে চলেছে।’ আর হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স সতর্কতা জারি করে বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের করোনা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি এখন সর্বোচ্চতম পর্যায়ে।’

এই পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে এসেছে করোনার সম্ভাব্য কয়েকটি টিকা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না ও ফাইজারের টিকা অন্যতম। প্রতিষ্ঠান দুটি এরই মধ্যে তাদের টিকার জরুরি ভিত্তিতে অনুমোদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছে আবেদন জানিয়েছে। ১০ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত জানা যাবে। ফাইজারের টিকাটি উদ্ভাবনে সহযোগিতা করেছে জার্মানির প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রে করোনার টিকার অনুমোদন আসামাত্রই সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করবেন তিন সাবেক প্রেসিডেন্ট। এর অংশ হিসেবে টিকাটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণে তাঁরা প্রকাশ্যে তা নেবেন। সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের চিফ অব স্টাফ ফ্রেডি ফোর্ড বলেছেন, বুশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি এবং হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের সদস্য দেবোরাহ বার্ক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ফোর্ড বলেন, টিকায় জনগণের আস্থা তৈরি করতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ক্যামেরার সামনে তা নেবেন।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রেস সেক্রেটারিও সিএনএনকে বলেছেন, সবাইকে টিকা নিতে উৎসাহিত করতে সাবেক এই ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে টিকা নেবেন। আর সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অ্যান্থনি ফাউসি যদি বলেন যে অনুমোদনপ্রাপ্ত টিকা নিরাপদ ও কার্যকর, তাহলে তিনি তা নিতে আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনেই টিকাটি নেব। তা না হলে টিকা নেওয়ার দৃশ্য ধারণ করে পরে তা প্রচার করব। জনগণকে আমি জানাতে চাই যে বিজ্ঞানে আমার আস্থা রয়েছে এবং আমি করোনা সংক্রমিত হতে চাই না।’

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জনাথন রেইনার সিএনএনকে বলেছেন, খুব সাধারণ কিছু পদক্ষেপে এই মৃত্যুর মিছিল ছোট করা যেত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেসব পদক্ষেপ নেননি। তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহ থেকে আমরা করোনায় দিনে তিন হাজার মৃত্যু দেখব বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটা দিনই হবে একেকটি ৯/১১।’

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার জঙ্গিরা যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করে হামলা চালায়। এসব হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। আহত ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন ২৫ হাজারের বেশি মানুষ। ইতিহাসে এই ঘটনা ’৯/১১’ হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *