আপিল প্রক্রিয়া শুরু করেছেন মিন্নির বাবা

বরগুনার চাঞ্চল্যকর শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি নিয়ে শনিবার রাতে বরগুনা থেকে ঢাকায় পৌঁছান মিন্নির বাবা। এরপর রোববার বিকেলে তিনি আপিল প্রক্রিয়া শুরু করেন।

বিকেল ৪টার দিকে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর মোবাইল ফোনে সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতে আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছি।

এদিকে রিফাত শরীফ হত্যা মামলার রায়ের ৪২৫, ৪২৬ ও ৪২৭ পৃষ্ঠা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে এই মামলার ঘটনার পরিকল্পনার মূল উদ্যোক্তা (মাস্টারমাইন্ড) বলে আখ্যায়িত করেছেন আদালত। তার কারণেই রিফাত শরীফ খুন হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘রিফাত ফরাজী, রাব্বি আকন, সিফাত, টিকটক হৃদয়, মো. হাসান ও মিন্নি রিফাত শরীফকে হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ঘটনার তারিখ, সময় ও স্থানে এই মামলার ঘটনা ঘটাইয়া তাহাকে খুন করেন। যা পেনাল কোডের ৩০২ তৎসহ পঠিত ৩৪ ধারার অধিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ করিয়াছে মর্মে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে।’

আদালত বলেন, ‘কতিপয় ব্যক্তি মিলিয়া কোন অপরাধমূলক কাজ করিলে সেই অপরাধের জন্য তাহাদের প্রত্যেককে সমানভাবে দায়ী করা হইবে। সেই সেই কারণেই দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত সকল আসামি সমানভাবে অপরাধী।’

আদালত মিন্নি প্রসঙ্গে বলেন, ‘আসামি মিন্নি এই মামলার ঘটনার মূল পরিকল্পনার মূল উদ্যোক্তা (মাস্টারমাইন্ড)। তার কারণেই রিফাত শরীফকে খুন হতে হয়েছে। তার মা-বাবাকে পুত্র শুন্য হতে হয়েছে। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হইলে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া তার (মিন্নির) সম বয়সী মেয়েদের বিপদগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এই মামলার তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্চনীয়।’

মামলার রায়ের ১১ ও ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আনুমানিক ১০টায় ভিকটিম রিফাত শরীফ মিন্নিকে নিয়ে কলেজ হইতে বাহির হইয়া যাবার উদ্দেশে কলেজ গেটের বিপরীত পাশে রাখা তাহার মোটরসাইকেলের দিকে চাইতে থাকিলে আসামি মিন্নি পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্যান্য আসামিকে ভিকটিম রিফাত শরীফকে সুযোগ করিয়া দেওয়ার কৌশল হিসেবে রিফাত শরীফের মোটরসাইকেলে না উঠিয়া পিছন হইতে পুনরায় কলেজ গেটের দিকে ফিরিয়া যায়। ওই সময় নিহত রিফাত শরীফ আসামি মিন্নিকে ফিরাইয়া আনার উদ্দেশে পিছন পিছন কলেজ গেটের দিকে যায়। তখন আসামি মিন্নি, আসামি রিফাত ফরাজীকে ইশারা দেয়। সাথে সাথে শিশু (আসামি) রিশান ফরাজী ভিকটিম রিফাত শরীফের দুই হাতসহ কোমড় পিছন হইতে ঝাপটাইয়া ধরে ও আসামী রিফাত ফরাজী শার্টের কলার ধরে। তাহাদের সাথে আসামী রাব্বি আকন, টিকটক হৃদয়, সিফাত এবং শিশু রিফাত হাওলাদার, রায়হান, নাঈম, তানভীর, প্রিন্স ও নাজমুল গং ভিকটিম রিফাত শরীফকে কলেজ গেট হইতে টানা হেচড়া করিয়া মারিতে মারিতে ক্যালিক্স একাডেমির গেটের সামনে রাস্তার উপর নিয়ে যায়। ওই সময় আসামি মিন্নি পূর্বপরিকল্পিতমতে তাহাদেরকে কোনরুপ বাধা প্রধান না করিয়া তাদের পিছন পিছন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে হাটিয়া যায়।’

গত বছরের ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে কিশোর গ্যাং বন্ড বাহিনী কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে। ওই হত্যাকাণ্ড সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

ঘটনার পরদিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা মো. আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।

এরপর পুলিশ একে একে গ্রেপ্তার করে এজাহারভুক্ত আসামিদের। রিফাতের ওপর হামলার ছয়দিন পর ২ জুলাই ভোর রাতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন এ মামলার আলোচিত প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। এক পর্যায়ে সাক্ষী মিন্নিকে আসামি করা হয় এই মামলায়।

সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *