ধরা ছোয়ার বাইরে ড্রাইভার মালেকের আশ্রয়দাতাগণ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা আবদুল মালেক ওরফে বাদলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের অনেকে এখনো বহাল আছেন। কেউ কেউ অবসরে গেছেন। ১৯৮৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালকের চাকরি পাকাপোক্ত করে মালেক ক্রমেই হয়ে ওঠেন ‘মালেক সাহেব’। ধীরে ধীরে কবজায় নেন গাড়িচালকদের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতির মতো কাজগুলো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ তাঁকে বাধা দেননি।

র‍্যাব-১ গত রোববার আবদুল মালেককে রাজধানীর তুরাগ থানার দক্ষিণ কামারপাড়ার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বেশুমার সম্পদের তথ্যও ক্রমে বেরিয়ে আসতে থাকে। তারপরও গতকাল মঙ্গলবার অধিদপ্তরের কমপক্ষে পাঁচ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আবদুল মালেক সম্পর্কে সমীহ করে কথা বলেন। অধিদপ্তরের গাড়িচালকদের নাম ধরে ডাকার রেওয়াজ থাকলেও আবদুল মালেককে সবাই মালেক সাহেব বলে সম্বোধন করেন। আদতে মালেক একা নন, অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তারকারী একটি চক্রের তিনি একজন সদস্যমাত্র।

এই চক্রকে সহযোগিতা দিয়েছেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন। গাড়িচালক আবদুল মালেক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই ব্যক্তির অনুসারী স্বাস্থ্যের তৎকালীন মহাপরিচালক শাহ মুনীর হোসেনের গাড়ি চালাতেন। এরপর যাঁরা মহাপরিচালক পদে এসেছেন, আবদুল মালেক তাঁদের গাড়ি না চালালেও ‘ড্রাইভারস অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করে তাঁর সভাপতি হয়ে বসেন। তাঁর কথামতো ওঠবস করতে শুরু করেন অধিদপ্তরের সব গাড়িচালক।

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবের পর স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির নানা দিক উঠে আসতে থাকে। যদিও মহাখালীর ওয়্যারলেস গেট এলাকার স্বাস্থ্য ভবনে ঢোকার মুখে হলদে রঙের ওপর কালো কালিতে বড় বড় হরফে শোভা পাচ্ছে, সদ্য সাবেক মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের বাণী, ‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবদুল মালেক যে চক্রের সদস্য, সেই চক্রের বাকি সদস্যরা মহাপরিচালক, পরিচালকসহ (প্রশাসন) শীর্ষ পদধারীদের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এখনো তাঁরা বহাল। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে সদ্য যোগ দিয়েছেন শেখ মো. হাসান ইমাম। তিনি  বলেন, বিধি অনুযায়ী আবদুল মালেককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় তাঁর সঙ্গে যাঁদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে, তাঁদের ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমান প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্তদের ব্যাপারে শূন্য সহনশীল (জিরো টলারেন্স)।

র‍্যাব জানতে পেরেছে, গাড়িচালক মালেক যে চক্রের সদস্য, সেটির অনেক সদস্য এখনো চাকরিতে বহাল আছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চক্রের সদস্যদের একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা বাদে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির নথিপত্র ঠিকঠাক করেন। এর বাইরেও তিনি অর্গানোগ্রাম তৈরি, পদ সৃষ্টি ও স্থায়ীকরণের বিষয়টি দেখভাল করেন। আরেকজন স্টেনোগ্রাফারের পদে ছিলেন। নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, একজন কর্মচারীকে স্টেনোগ্রাফারের পদ থেকে পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা হয়। কিছুদিন পর তিনি আবারও মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারীর পদে চলে আসেন। আবদুল মালেকের একজন আত্মীয়ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে।

তাঁদের প্রত্যেকেই অফিস সহকারী পদে চাকরি শুরু করে পদোন্নতি পেয়ে অধিদপ্তরেই রয়ে গেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়া কেউ বদলি হন না। চিকিৎসক বাদে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, তাঁদের কর্মক্ষেত্র হলো অধিদপ্তর, মাঠপর্যায়ের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। এক কার্যালয় থেকে অন্য কার্যালয়ে বদলি করা যাবে না এমন কোনো আইন নেই। তবে রেওয়াজ হলো, অধিদপ্তরে যাঁরা কর্মরত আছেন, তাঁদের অধিদপ্তরেরই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বদলি করা হয়। মালেক চক্রের সব সদস্যের চাকরির শুরু অধিদপ্তরে, শেষও এখানে।

তবে আবদুল মালেকের আত্মীয়স্বজনদের ক্ষেত্রে এই রেওয়াজ মানা হয়নি। তাঁর আপন ভাই আবদুল খালেক অধিদপ্তরের ডেসপাচ শাখা ও ভাগনে সোহেল শিকারী প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালকের গাড়ি চালান। তবে তাঁর মেয়ে নওরীন সুলতানা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দিলেও প্রেষণে মতিঝিলের আরবান ডিসপেনসারিতে এবং ভাইপো আবদুল হাকিম অফিস সহকারী হিসেবে প্রেষণে কমিউনিটি ক্লিনিকে আছেন। ভায়রা মাহবুব কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোলে (সিডিসি) গাড়ি চালান।

সাততলা বাড়ির তৃতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন আবদুল মালেক। নিজের ঘরের সামনে লাগিয়েছেন কারুকার্যসম্পন্ন দরজা। গতকাল দুপুরে তুরাগের বামনারটেক এলাকায়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো কার্যালয় মহাখালী কাঁচাবাজারসংলগ্ন জায়গায়। এখানেই বসেন পরিবহন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন খান। তাঁর কার্যালয়ে ঢোকার আগে পথের দুই পাশে ৪২টি গাড়ি দেখা গেল গতকাল। এর বাইরেও অগণিত গাড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসব গাড়ির চালকদের নেতা হলেন আবদুল মালেক।

অধিদপ্তরের আওতায় গাড়ির সংখ্যা কত, চালকই বা কত? জানতে চাইলে আলাউদ্দীন খান বলেন, রাজস্ব খাতে মোট গাড়ি আছে ১৭টি। সব কটিই বেশ পুরোনো। এর মধ্যে ১৩টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া। গাড়িচালক আছেন ৪৮ জন। উন্নয়ন খাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৪টি কর্মসূচি আছে। সেখানে গাড়ির সংখ্যা কত, তাৎক্ষণিকভাবে তা তিনি বলতে পারেননি। এগুলো দেখাশোনার ভারও তাঁর নয়। কর্মসূচি ব্যবস্থাপকেরা এসব গাড়ির দায়িত্বে আছেন। তবে ১৪টি কর্মসূচির একটি অসংক্রামক ব্যাধিবিষয়ক। শুধু এই কর্মসূচিতেই গাড়ির সংখ্যা ৪৬।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়ি কে কোনটা চালাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতেন মালেক। গাড়ির তেল, গাড়ির যন্ত্রপাতি কেনা এবং গাড়ি মেরামতের বিষয়গুলোও হতো তাঁর সিদ্ধান্তমতো। কখনো কেউ আপত্তি তুললেই তিনি (মালেক) তাঁকে আর গাড়িচালক দিতেন না। গতকাল একজন কর্মকর্তা বলেন, গাড়ি বরাদ্দ পাওয়ার পর চালকের জন্য তিনি পরিবহন পুলে যোগাযোগ করেন। পরিবহন পুল থেকে মালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। মালেক ওই কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, পরিবহন পুল থেকে কোনো চালক দেওয়া হবে না। এমন কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ কেটে দেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো কার্যালয়ের ক্যানটিন চালান মালেকের মেয়েজামাই। গতকাল ক্যানটিন বন্ধ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শাহ মুনীর হোসেনের পর মহাপরিচালক হন খন্দকার সিফায়েৎউল্লাহ। তিনি আবদুল মালেকসহ কয়েকজনকে দুই বছরের জন্য ক্যানটিন পরিচালনার অনুমতি দিয়েছিলেন। এরপর থেকে ক্যানটিন তাঁরাই চালাচ্ছিলেন। এ জন্য সরকারি বিধি অনুযায়ী দরপত্র ডাকার কথা এবং সরকারি কোষাগারে ক্যানটিন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্তদের টাকা দেওয়ার কথা। এ নিয়ে অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের সাবেক পরিচালক বেলাল হোসেন তৎকালীন মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের কাছে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টর থেকে বেরিয়ে একটু পশ্চিম দিকে গেলেই শুরু তুরাগ থানার বামনারটেক এলাকা। বামনারটেক সড়ক ধরে কিছু দূর এগোলে হাতের ডানে রমজান মার্কেট এলাকায় গাড়িচালক আবদুল মালেকের বাড়ি। প্রায় সাড়ে চার কাঠার ওপর সাততলা ভবন। ভবনের সামনে সাত থেকে আট কাঠা ফাঁকা জায়গা। দুটি আলাদা ফটকে রয়েছেন দুজন নিরাপত্তাকর্মী।

নিরাপত্তাকর্মী শহীদুলকে সঙ্গে নিয়ে মালেকের ফ্ল্যাটে (তৃতীয় তলা) যান এই প্রতিবেদক। ঘরের দরজাটি কারুকাজখচিত ও বিলাসবহুল। সেখানে দেখা হয় মালেকের বোন ফাতেমার সঙ্গে। তিনি জানান, মালেককে ধরে নেওয়ার পর থেকে সন্তানেরা কেউ বাড়িতে নেই।

মালেকের বাড়ি থেকে একটু দূরেই তুরাগের দক্ষিণ রাজাবাড়ি এলাকা। এখানে ‘ইমন ডেইরি ফার্ম’ নামের একটি গরুর খামার রয়েছে মালেকের। খামারের পাশেই তাঁর বাবা আবদুল বারী মাইজভান্ডারীর নামে একটি মাজার রয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ২০০৫ সালে মালেক এই মাজার প্রতিষ্ঠা করেন।

পেশাজীবী চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব এহতেশামুল হক চৌধুরী  বলেন, আবদুল মালেক, আবজাল, সাহেদ বা সাবরিনাদের সামনে রেখে প্রভাবশালীরা আখের গুছিয়েছেন। যাঁদের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ সুবিধা পেয়েছেন, ধরা পড়ার পর হাতে হাতকড়াও উঠেছে। কিন্তু যাঁরা নির্দেশদাতা, তাঁরা আড়ালে থেকে গেছেন। প্রতিটি ঘটনায় নির্দেশদাতাকে খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। না হলে এ ধরনের অভিযানের সুফল পাওয়া যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 2 =

Translate »