বাঁচার আকুতি ময়মনসিংহের হকি কারিগর রাহাদ সারোয়ারের

রাহাদ সারোয়ারের জীবনটাই সংগ্রামে ভরপুর। বয়স যখন ৩ বছর তখন বাবাকে হারিয়েছেন রাহাদ। ছেলে আর ৪ মেয়েকে নিয়ে তখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল রাহাদের মায়ের। বড় হয়ে হকি স্টিককে জীবিকার প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছেন ময়মনসিংহের সেনবাড়ির রাহাদ। ঢাকায় দ্বিতীয় বিভাগ লিগের দল তেজগাঁও অগ্রগামীতে খেলে ২০ টাকা পুরস্কার পেয়ে মা-বোনদের জন্য ইলিশ মাছ কিনে নিয়েছিলেন পরবর্তীতে দেশের হকি অতি পরিচিত মুখ হওয়া রাহাদ।

বয়স ৩৮ বছর। খেলোয়াড়ের জার্সিটা এখনও তুলে রাখেননি। কখনও মাঠে খেলেন, কখনও নতুনদের হকি শেখান। ময়মনসিংহের হকির ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্বটা যেন নিজের কাঁধেই নিয়েছেন ৩৫ বছর আগে বাবা হারানো এই যুবক। তার কাছেই হকিতে হাতেখড়ি হয়েছে জেলার অনেক তরুণ-তরুণীর। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। মাসখানেক আগেও সকাল-বিকেল প্রায় ১০০ ছেলেমেয়েকে হকি স্টিকের কারিশমা শেখাতেন। এখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তার কাছের মানুষরা বলছেন, অবস্থা ভালো নয়। এক কথায় মৃত্যুশয্যায়।

দীর্ঘদিন ধরে হকি খেলছেন দেশের শীর্ষ লিগে। টানা ১০টা লিগ তিনি খেলেছেন প্রিমিয়ারের দল অ্যাজাক্স স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। নামের সাথে বড় তারকার তকমা হয়তো লাগাতে পারেননি, জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয়নি কখনও। কিন্তু হকি মাঠের লড়াকু খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছেন। জাতীয় দলে না খেললেও খেলেছেন জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৮ দলের জার্সিতে।

২০০২ সালে বিকেএসপিতে হয়েছিল বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা ও নেপালকে নিয়ে চার জাতি অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্ট। জাতীয় দলের ক্যাম্পে একবার ডাকও পেয়েছিলেন। ঢাকার পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম ও রাজশাহী লিগেরও পরিচিত মুখ।

মাসখানেক আগে হকি অন্তঃপ্রাণ রাহাদ সারোয়ারের হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হলে বাড়িতেই চিকিৎসা করেন। অবস্থার উন্নতি না হলে ভর্তি করা হয় ময়মনসিংহ মেডিকেলে। তার লিভারে ইনফেকশন ধরা পড়ে। সেখানে ১৭ দিন চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে ডাক্তারের পরামর্শে তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানী বিআরবি হাসপাতালে।

ফয়সাল আল মামুন রবিন নামের আরেক যুবককে নিয়ে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠে অনাবাসিক হকি একাডেমি করেছেন রাহাদ। বিনা পারিশ্রমিকে ৬৫ জন ছেলে ও ২২ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দেন সকাল-বিকেল। খেলা শেখানোর পাশাপাশি নিজেও খেলেন। ২০১৮ সালে হওয়া সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন ময়মনসিংহ জেলা দলের অধিনায়ক। ছেলে ও মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলের কোচের ভূমিকায়ও থাকেন।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও হকির কথাই বলেন রাহাদ। বাঁচতে চান, হকি স্টিক হাতে আবার খেলতে চান, বাচ্চাদের খেলা শেখাতে চান। তার সহকারী হিসেবে কাজ করা ফয়সাল আল মামুন রবিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সব সময়ই তার খোঁজ নিচ্ছি। যখনই কথা বলি তখনই হকি নিয়ে স্বপ্নের কথা বলেন রাহাদ। বারবার বলেন, ‘ময়মনসিংহের হকিকে হারিয়ে যেতে দিও না।’ একাডেমির ছেলেমেয়েরা তো তার জন্য কান্নাকাটি করছে। মঙ্গলবার বিকেলে অনুশীলনের সময় সবাই তার জন্য দোয়া করেছে। ঢাকা গিয়ে রাহাদকে দেখতে চায় তারা। আমি বারণ করেছি।’

আর্থিক অবস্থা ভালো নয় রাহাদদের। হকি খেলে সংসার চালাতেন, নতুন ঘর তুলেছেন হকি খেলার আয় দিয়ে। হকির পেছনে অর্থ ব্যয় করতেন বাচ্চাদের শেখাতে গিয়ে। মাঠের লড়াকু সেই রাহাদ সারোয়ার এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বাঁচার আকুতি করছেন।

জাতীয় যুব দলের গোলরক্ষক হিমেল আরাফাত ইয়াসিন সর্বশেষ দুটি প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন রাহাদের সঙ্গে অ্যাজাক্স স্পোর্টিংয়ে। রাহাদ সম্পর্কে হিমেল বলছিলেন, ‘রাহাদ ভাই হকি অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ। নিজে খেলেন, ছেলেমেয়েদের খেলা শেখান। তার কাছ থেকেই ময়মনসিংহের অনেক ছেলেমেয়ে হকি খেলা শিখেছে। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে এখন তিনি হাসপাতালে। সুচিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে না হলে দেশের হকির পরিচিত এই খেলোয়াড়ের জীবন বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

হকি খেলার অর্থ দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ময়মনসিংহের হকির উন্নয়নে একাডেমি পরিচালনা করতেন রাহাদ সারোয়ার। ময়মনসিংহের হকির ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায় সেই লড়াই করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। হকির জন্য কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় থাকলেও তাতে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শরীরে বাসা বাঁধা রোগ।

রাহাদ কি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে হকি স্টিক নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন? খেলতে পারবেন প্রিমিয়ার লিগ এবং জেলা দলের হয়ে? ময়মনসিংহের ছেলেমেয়েদের বড় হকি খেলোয়াড় বানাবেন- সেই স্বপ্নও কি শেষ হয়ে যাবে রাহাদের? আজীবন লালিত এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে পারে তার সুস্থ জীবনে ফিরে আসার মাধ্যমে। আর তাকে সুস্থ্য হতে চাই উন্নত চিকিৎসা, অনেক টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =

Translate »