গ্রাম আদালতে মামলা কমেছে

■ এপ্রিলে গ্রাম আদালতে মামলা হয় ৩৭২টি, মে মাসে ২৩৪টি।

■ ৪,৫৬৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ১,০৮০টিতে নিয়মিত গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চলে।

স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে দেশের গ্রাম আদালতগুলোতে মামলা হতো ছয় থেকে সাত হাজার। করোনার কারণে গত এপ্রিল ও মে মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৩০০-তে। অবশ্য জুন ও জুলাই মাসে মামলার সংখ্যা বাড়লেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তা বেশ কম।

গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী, ছোটখাটো ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। এই আদালত সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেন। চুরি, ঝগড়া, প্রতারণা, ভয়ভীতি দেখানো, নারীকে অমর্যাদা করা, পাওনা টাকা আদায়, গবাদিপশুর ক্ষতির মতো বিরোধের নিষ্পত্তি গ্রাম আদালত করতে পারেন।

গ্রাম আদালতে মামলা করে গত মার্চ মাসে টাকা ফেরত পেয়েছেন গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামের আবু তালেব। তিনি গত বছরের জুলাই মাসে সুদে ৫০ হাজার টাকা ধার দিয়েছিলেন পাশের সরকারপাড়া গ্রামের কামাল হোসেনকে। কিন্তু টাকা ফেরত না দিয়ে বিদেশ চলে যান কামাল। এ নিয়ে আবু তালেব গ্রাম আদালতে মামলা করেন কামালের বাবা আবদুস সাত্তারের বিরুদ্ধে।

একাধিক দিন শুনানির পর তালেবের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন আবদুস সাত্তার। ৭ মার্চ আদালতে উপস্থিত হয়ে ৫০ হাজার টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তির আবেদন করেন তিনি। আদালত মামলা নিষ্পত্তি করে দেন।

আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘জজকোর্টে মামলা করতে গেলে সময় লাগত, টাকা খরচ হতো। তাই চেয়ারম্যানের এখানে মামলা করি। তিন মাসের মধ্যে চেয়ারম্যান টাকা তুলে দিসে।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে গ্রাম আদালতে মামলা হয় ৭ হাজার ৪১১টি। ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যাটি ছিল ৬ হাজার ৫৭০টি। দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ওই মাসে মামলা হয় ৫ হাজার ৭২৪টি। এপ্রিল ও মে মাসে মামলা কমে যায়। এপ্রিলে ৩৭২টি এবং মে মাসে ২৩৪টি মামলা হয়।

করোনার কারণে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে সাধারণ ছুটি ছিল। ছুটি শেষে গ্রাম আদালতের মামলার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। জুন মাসে মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৫৩০টি এবং জুলাই মাসে মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৯০৬টি। তবে মামলা কমলেও ছোটখাটো অপরাধ কমেছে কি না, সে–সংক্রান্ত তথ্য বা পর্যবেক্ষণ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পে রাখা হয় না।

প্রচলিত আদালতে মামলাজট কমানো এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত আইন হয়। প্রচলিত আদালতে মামলাজট প্রসঙ্গে গত জানুয়ারিতে সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালত মিলে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৯টি। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩১ লাখ ২৭ হাজার ২৪৩টি।

দেশের ৪ হাজার ৫৬৯টি ইউপির মধ্যে ১ হাজার ৮০টিতে নিয়মিত গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চলে। বাকি ইউনিয়নগুলোতে গ্রাম আদালত কার্যক্রম কেমন চলছে বা চলছে কি না, সে–সংক্রান্ত হালনাগাদ কোনো তথ্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই।স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সব ইউনিয়নেই গ্রাম আদালত কার্যকর করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ছোট বিরোধগুলো গ্রাম আদালতে মীমাংসা হলে প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় চাপ কমবে। গ্রাম আদালতে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়, জনগণের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে

নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

বর্তমানে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচন হয়। ইউপি চেয়ারম্যানই গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান। তাই গ্রাম আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন।

এ বিষয়ে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরদার এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের যেকোনো পক্ষ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর আবেদন করে গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান বদলাতে পারেন। আর গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপিল করারও সুযোগ রয়েছে। গ্রাম আদালত সক্রিয় করতে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা প্রথম আলোকে বলেন, গ্রাম আদালতগুলো কার্যকর করা উচিত, তবে আরও সতর্কতার সঙ্গে। এখানকার সিদ্ধান্তগুলো নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত হচ্ছে কি না, তার তদারকি থাকতে হবে। সব ইউনিয়নে গ্রাম আদালত কার্যকর করা হলে প্রচলিত আদালতে মামলার চাপ কমবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − 8 =

Translate »