মেসি মানেই টাকা! মেসি মানেই বাণিজ্য!

লিওনেল মেসি বার্সেলোনা ছাড়লে কোথায় যাবেন? ম্যানচেস্টার সিটি, পিএসজি নাকি ইন্টার মিলান! ফাঁকে ফোকরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও নাকি কথা বলেছে আর্জেন্টাইন তারকার বাবার সঙ্গে।

বুরোফ্যাক্সের মাধ্যমে বার্সেলোনাকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই মেসির পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। পিএসজি, ইন্টার কিংবা ইউনাইটেডের কথা শোনা গেলেও মেসির নতুন ঠিকানা হিসেবে খুব করেই আলোচিত হচ্ছে পেপ গার্দিওলার সিটিকে নিয়ে। একে তো মেসির পুরোনো গুরু গার্দিওলা, তারওপর মেসির সঙ্গে গার্দিওলার কোচিং-দর্শনটা খুব করেই যায়। এ ছাড়াও সিটি আর মেসিকে নিয়ে কিছু প্রকাশিত সংবাদ ব্যাপারটিকে উসকে দিয়েছে আরও। হঠাৎ করেই যেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেসির দলবদল এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ের রয়েছে। এমনিতে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির চুক্তি। এর আগে বার্সেলোনা ছাড়তে চাওয়াটা ইঙ্গিত দিচ্ছে সামনে অনেক নাটক বাকি। বার্সেলোনা বলছে, তারা মেসিকে ছাড়বে না। আর ছাড়লেও তাঁর রিলিজ ক্লজের ৭০ কোটি ইউরো পাই পাই করে বুঝে পেলেই তবে। মেসির ট্রান্সফারের অর্থটা যে অনেক বড় অঙ্কের হবে সেটা বুঝে নিতে কোনো বিরাট বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। তবে, ভেতরে-ভেতরে যা-ই থাকুক, এটা সত্য মেসি দল ছাড়তে চাচ্ছেন। সেটি হয়তো নতুন কোনো চ্যালেঞ্জের আশাতেই অথবা ন্যু ক্যাম্পের প্রশাসকদের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়েই।

এমন কিছু নিশ্চয়ই বার্সেলোনার জন্য সুখবর নয়। দুই দশক ধরে মেসি বার্সার ঘরের ছেলে, ব্যাপারটা যদি কেউ ভেবে থাকেন বার্সেলোনার ডাকসাইটে প্রশাসকেরা মেসির সঙ্গে বিচ্ছেদের শঙ্কায় বিমূঢ়, তাহলে ভুলই করবেন। মেসি অনেক বছর ধরেই ফুটবল দুনিয়ার খুব বড় বিপণন অনুষঙ্গ। কেবল এক মেসির নামের ওপরই বার্সেলোনা যে গত দুই দশকে কত শত কোটি ইউরোর ব্যবসা করেছে, সেটার হিসাব করতে গেলে মাথায় খারাপ হতে বাধ্য। বার্সেলোনা তাই চাইবে যেকোনো মূল্যে মেসিকে দলে ধরে রাখতে। কিন্তু, ইতিহাস বলছে, কোনো খেলোয়াড়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে দলে ধরে রাখাটা যে বোকামি, সেটি নিশ্চয়ই বার্সা প্রশাসকেরা খুব ভালো বোঝেন। নেইমারকে কি তারা রাখতে পেরেছিলেন। উল্টো ২২ কোটি ইউরো ট্রান্সফার গুনে নিয়েই তাঁকে পিএসজিতে যেতে দিয়েছিলেন। মেসির ক্ষেত্রে যে এমন কিছু হবে, সেটা বললে বোধ হয় খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না।

মেসির সম্ভাব্য আগমনে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এখন চাপা আনন্দ। এত দিন যেটি জল্পনা-কল্পনার পর্যায়ে ছিল, সেটি এখন পুরোপুরি বাস্তব সম্ভাবনা। মেসির মতো একজন খেলোয়াড় যে একটা লিগের জন্য বাণিজ্যিক দিক দিয়ে কতটা লাভজনক, সেটি সবাই জানেন। এমনিতেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, টটেনহামের মতো ক্লাবগুলোর ভক্তের সংখ্যা অগণিত। এর মধ্যে যদি মেসির মতো একজন খেলোয়াড় কোনো একটি ক্লাবের অংশ হয়ে যান, তাহলে আর্থিক দিক দিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ অন্য মাত্রা নেবে। ম্যানচেস্টার সিটিতে মেসি যোগ দিলে ক্লাবটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নতুন মোড় নেবে।

সিটির প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোও তো মেসির মাধ্যমে লাভবান হবেন। ধরুন মেসি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলছেন। করোনা পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটেছে, মাঠে দর্শক প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। কেবল টিকিট বিক্রি করেই ক্লাবগুলো যে লাভ করবেন, সেটা দুর্দান্ত। পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যা বেড়ে যাবে লিগে, টেলিভিশন স্বত্বের দামও বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। সিটি কেবল মেসির নামাঙ্কিত রেপ্লিকা জার্সি বিক্রি করেই তো বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নেবে। এরই মধ্যে তো খবর বেরিয়েছে, মেসি দলে আসবেন এটা নিশ্চিত হলেই নাকি ক্লাব রেপ্লিকা জার্সি কিংবা মেসির বিভিন্ন মার্চেন্ডাইজ বিক্রি করে বড় অঙ্কের অর্থ পকেটে ঢোকাবে। এতে নাকি মেসির ট্রান্সফার ফি’র টাকার বড় অংশই তুলে নেওয়া যাবে।

এসবই ভবিষ্যতের কথা, কিংবা কোনো সম্ভাবনার। কিন্তু মেসি ম্যানচেস্টার সিটিতে কেন আসবেন? মেসির মতো চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা, ক্লাব ফুটবলে সম্ভব-অসম্ভব সব কীর্তি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা তারকা খেলোয়াড়ের সিটির মতো ক্লাবে আসা মানেই চ্যালেঞ্জ হাতে নেওয়া। নিজের ক্যারিয়ারকে ভিন্নমাত্রা দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁর পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বী রোনালদো ২০১৮ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এসেছিলেন জুভেন্টাসে। মেসি সেটি করবেন কিনা, তা সময়ই বলে দেবে।

বার্সেলোনা কি তাঁকে ছাড়বে? ২০২১ সাল পর্যন্ত যে চুক্তি, সেটি মেসি ভঙ্গ করলে বার্সা আদালতে যেতে পারে। তবে মেসির চুক্তিতে আছে, সেটি শেষ হওয়ার আগেও মেসি চাইলে ক্লাব ছাড়তে পারেন। ব্যুরোফ্যাক্সের পাঠানো বার্তায় এই ধারাটিরই উল্লেখ করেছেন মেসি। সে ক্ষেত্রে তাঁকে পেতে আগ্রহী ক্লাবকে দলবদলের পেছনে কোনো খরচ করতে হবে না। কিন্তু তাতে বড় একটা ‘কিন্তু আছে। মেসি যদি ২০২০ সালে ক্লাব ছাড়েন, তাহলে তাঁকে সিদ্ধান্তটা নিতে হতো ১০ জুন, নতুন মৌসুম শুরুর ২০ দিন আগে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এবারের মৌসুম-সূচি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় মৌসুমের খেলা বন্ধ ছিল। নতুন মৌসুম শুরু হতে তাই দেরি হচ্ছে।

মেসিকে ধরে রাখতে এটাই বার্সেলোনার যুক্তি। আগস্টে এসে যেহেতু তিনি বলেছেন, তাই বিনা মূল্যে দল ছাড়তে পারবেন না। কিন্তু মেসির আইনজীবী তা মানতে রাজি নন। এমন চলতে থাকলে বার্সা প্রশাসকদের সঙ্গে মেসির আদালতেই দেখা হবে।

বার্সা যে মেসিকে ধরে রাখতে পারছে না, সেটি তারা হয়তো বুঝতে পারছে। তাই আদালতের লড়াইয়ের পাশাপাশি দলটির লক্ষ্য এখন মেসিকে নিয়ে শেষ ব্যবসাটা করে ফেলা। আর সেটি যে বিপুল অঙ্কের ট্রান্সফার ফি, সেটা সবাই জানেন। ২০১৭ সালে নেইমারকে ২২ কোটি ইউরোতে বিক্রি করেছিল বার্সা। মেসির ক্ষেত্রে এই অঙ্কটা তো বাড়বেই।

মেসি মানেই টাকা। মেসি মানেই বাণিজ্য। পৃষ্ঠপোষকদের আগ্রহ। সেটি তাঁকে কেউ পাক, কিংবা হারাক—পরিস্থিতিটা প্রায় একই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *