টিভি বিজ্ঞাপনের ময়নাতদন্ত

বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় আমেরিকান টেলিভিশনে ঘড়ির, ১৯৪১ সালের পহেলা জুলাই বেসবল খেলার আগে ‘বুলেভো ওয়াচের’। বিজ্ঞাপনটি প্রচারে বুলেভো ওয়াচের খরচ হয়েছিল ৯ ডলার। সম্প্রচারের জন্য ৪ ডলার, স্টেশন চার্জ ৫ ডলার।

এদিকে বাংলাদেশে প্রথম সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপনটি ছিল ৭০৭ ডিটারজেন্ট সাবানের ১৯৬৭ সালে। আর এখন তো বিজ্ঞাপন ছাড়া টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি ভাবাই যায় না। ক্রমেই একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে টিভি ও বিজ্ঞাপন। তারপরেও এখন অশনিসংকেত কেন বাজে টিভি মিডিয়ায়? আসুন পোস্টমর্টেম করি কেন এই দৈন্য।

করোনাকালীন বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দায় লোক ছাটাইয়ের ঢল নেমেছে সবখানে। টেলিভিশনও এর ব্যতিক্রম নয়। পেশাগত কারণেই আমাকে মাঝে মাঝে কত দীর্ঘশ্বাসের করুণ আর্তনাদ শুনতে হয় সে কথা না হয় চাপাই থাক। না যায় বলা, না যায় সহ্য করা অবস্থা।

দেশীয় চ্যানেল অর্থনীতি:

বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো এখনও পর্যন্ত ফ্রি-টু-এয়ার, সে কারণে বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে আয়কৃত অর্থ ছাড়া চ্যানেলগুলোর অন্য কোনো আয়ের উৎস নেই। ফলে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার ওপর। সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশনের নিজস্ব কোনো নীতিমালা না থাকায় এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো একজন আরেকজনের সাথে কখনো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় আবার কখনো কখনো যুথবদ্ধভাবে বিজ্ঞাপনের মূল্য এমন এক পর্যায়ে নামিয়ে আনে যা দিয়ে একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালানো সত্যিই কষ্টকর।

করোনাভাইরাস মহামারী সৃষ্ট এই দুঃসময়ের প্রেক্ষাপটে টেলিভিশন মিডিয়ায় তৈরি হয়েছে এক বিরাট অনিশ্চয়তা। মিডিয়ায় কর্মরতদের বছরের পর বছর বেতন-ভাতা বাড়ছে না, বন্ধ থাকছে উৎসব বোনাস। আবার ক্ষেত্র বিশেষে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যয় সংকোচের জন্য বেছে নিচ্ছে কর্মী ছাটাই পন্থা। কর্তৃপক্ষ ভুলে গেছে তার এই দক্ষ, যোগ্য জনশক্তি সবসময় পাশে ছিল ভাল ও খারাপ সময়টায়।

প্রসঙ্গতই তাই অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের দক্ষ কর্মীরা বারবার ধর্না দেয় বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে। বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে তারা তাদের ব্যবসার বর্তমান অবস্থা এবং কর্মীদের বেতন-ভাতা, বোনাস কিছুই যে হচ্ছে না তা দীনভাবে তুলে ধরেন। এই সুযোগে কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থাগু নিজেদের সাহায্যকারী বা দাতা সংস্থা হিসেবে পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করে এবং বিজ্ঞাপনের মূল্য কমিয়ে দেয়। মার্কেটিং কর্মীরা একরকম বাধ্য হয়েই ঐ মূল্যেই বিজ্ঞাপন প্রচারে রাজি হয়। কিন্তু এত কম মূল্যে বিজ্ঞাপন চালিয়ে কোনো অনুষ্ঠানের মান ধরে রাখা আসলেই সম্ভবপর হয় না। এ যেন একটি দূষিত চক্র।

এজেন্সি যখন নিয়ন্ত্রক:

এজেন্সি টিভি চ্যানেলে বা মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন দিলে কমিশন পায়! এখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি!

কীভাবে? তাদের পক্ষে টেলিভিশনের শিডিউল মনিটরিং করে কিছু সংস্থা। বিল জমা দেয়ার ১০-২০ দিনের মধ্যে সেই সব সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে এজেন্সির চ্যানেলকে জানানোর কথা। যে বিজ্ঞাপনগুলো শিডিউল অনুসারে ঠিকমতো টেলিভিশন চ্যানেল প্রচার করে নাই, সেগুলোকে মিসিং স্পট বলে থাকে। এই মিসিং স্পটের বরাত দিয়ে একটা অঙ্ক কিছু এজেন্সি কেটে নেয়। এখানে ফাঁকিটা হলো ৪-৬ মাস পর মিসিং স্পটের নামে টাকা কেটে নেয়া। জান বাঁচানো ফরজ বিধায় চ্যানেল তখন প্রতিশ্রুত অর্থ সংগ্রহের স্বার্থে নিজের দৈন্যদশা ঢাকতে মিসিং স্পট বাবদ অর্থদণ্ড মেনে নেয়। শুধু কি তাই? বিজ্ঞাপনের প্রতিশ্রুত অর্থ ৩ মাসের মধ্যে পরিশোধের কথা থাকলেও তা ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যেও দেয়া হয়ে ওঠে না।

এটাতো গেল একটি এজেন্সির নিজস্ব পলিসির ঘটনা। এর থেকেও মারাত্মক ঘটনা ঘটে যখন এজেন্সি সিন্ডিকেট গঠন করে মিডিয়াকে জিম্মি করে। আবার কয়েকটা এজেন্সি, তাদের বেশি ক্লায়েন্ট বা বিজ্ঞাপন থাকায় কমিশনের উপরও আলাদা কমিশন নেন।

শুধু তাই নয়, যেহেতু কোন চ্যানেল কতটুকু বিজ্ঞাপন দেবে এটা নির্ভর করে এজেন্সির ওপর তাই মুখাপেক্ষী হতে হয় তাদের। অথচ প্রকৃত চিত্র হওয়া উচিৎ ছিল বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলি টিভি চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হায় ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলি। এর ফলশ্রতিতে অর্থনৈতিক সমস্যার কথা জানিয়ে বিভিন্ন চ্যানেল হয় ছাটাই নয় বার্তা বিভাগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসরকারি টিভি, রেডিও ও সংবাদপত্রসহ পুরো মিডিয়া এজেন্সির কাছে জিম্মি। এই জিম্মি দশা গণমাধ্যম কর্মীদের নিয়মিত বেতন, বোনাস না পাওয়া ও চাকরি হারানোর ভয়সহ চরম আতঙ্কিত করে রাখছে।

বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতে বিজ্ঞাপনের প্রভাব:

আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপনী সংস্থার মাধ্যমেই বিজ্ঞাপন দেয়। তাদের কিছু যৌক্তিক বা অযৌক্তিক অনুরোধ একটি টেলিভিশনের কাজের মানে ব্যাপক গুণগত প্রভাব ফেলে। আর এই কারণে বিজ্ঞাপন প্রদানকারীর চিন্তাধারা ও স্বার্থ রক্ষার্থে ক্ষেত্রবিশেষে অনুষ্ঠানের মান ব্যাপকভাবে নষ্ট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কখন কোন অনুষ্ঠান প্রচার হবে এবং কীভাবে একটি অনুষ্ঠান নির্মাণ হবে। ফলে কিছু চ্যানেলের দর্শক জনপ্রিয়তা কমছে। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়, কোন অনুষ্ঠানে কোন অতিথি থাকবেন তাও বিজ্ঞাপনদাতারা নির্ধারণ করে দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনুষ্ঠানের মান এবং অনুষ্ঠান নির্মাণের সাথে জড়িত প্রযোজক, পরিচালকদের মেধা ও সৃষ্টিশীলতা।

এবার কিন্তু আপনি ভ্রকুঁচকে বলতেই পারেন যে ‘বাংলাদেশের অনেক দর্শক প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল’’!

আমি বলবো “তথাস্তু! হক কথা।” দর্শক প্রিয় অনুষ্ঠানের তালিকা, যখন শুধু বিটিভি ছিল তখন হুমায়ুন আহমেদের নাটক ‘‘বহুব্রীহি’’ থেকে শুরু করে অধুনা ‘সংবাদ’ ভিক্তিক পর্যন্ত বিস্তৃত। পটপট করে যে কেউ বেশ কিছু অনুষ্ঠানের নাম আউড়ে যাবে। এতে কোনোই অসুবিধা নেই। কিন্তু আমি অন্য বিষয়ে বিনীতভাবে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেটি হলো বাংলাদেশের মানুষ কোন টেলিভিশন চ্যানেলটি দেখতে পছন্দ করে এবং কী ধরনের অনুষ্ঠান ও সংবাদ দেখেন সে বিষয়ে এখনও কোনো সংস্থার সঠিক কোনো জরিপ বা পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু কিছু চ্যানেল তাদের নিজস্ব উদ্যোগে এবং তাদের টেলিভিশনের মান ধরে রাখার স্বার্থে কিছু জরিপ চালিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিদেশী পণ্য বা তার পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে চাইলে দেশের একটি জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘‘কান্তার’’-এর রিপোর্ট নিয়ে থাকে। এবং তাদের রিপোর্টকে ভিত্তি করে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর দর্শক চাহিদা কম এবং বিদেশী চ্যানেলের জনপ্রিয়তা বেশি দেখিয়ে দেশীয় চ্যানেলে বিজ্ঞাপনের মূল্য কমিয়ে দেয়। বিদগ্ধ পাঠক কেন এমন হচ্ছে? ভাবুন একবার। ইদানিং গোঁদের উপর বিষ ফোড়ার মত যুক্ত হয়েছে ইউটিউব, নেটফ্লিক্স। অনলাইন মিডিয়ার সবকিছুর পরিচালনায় রসদ হচ্ছে বিজ্ঞাপন আর গুগল, ইউটিউব ও ফেসবুক দেখার উপর ভিত্তি করে চলছে অনলাইনগুলো।

সুপ্রিয় পাঠক! আমাদের মিডিয়াও কি এই অশুভ আগ্রাসনে হারিয়ে যাবে? এখানে মিডিয়া বলতে আমি টিভি, রেডিও, সংবাদপত্র, অনলাইন পত্রিকা বুঝাচ্ছি।

অনুষ্ঠান নির্মাণের দৈন্যদশা:

এটা প্রতীয়মান, অনুষ্ঠানের মান বিবেচনার মানদণ্ড যথেষ্ট পরিমাণ মানসম্মত নয়। তেমনি এখানে একটি কথা বলে নেয়া ভালো, নিম্নমানের অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য অনেকটাই দায়ী টেলিভিশন মালিক বা অপারেশন ম্যানেজমেন্টে যারা থাকেন তারা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো একটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করে প্রথমেই বিপণন বিভাগকে দিয়ে দেয়। বিপণন বিভাগ সেই অনুষ্ঠানটি নিয়ে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে নিয়ে যান বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছে বিক্রয়ের জন্য। দেখা যায় যেখানে একটি অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্ব তৈরিতে খরচ হয় ৬০-৮০ হাজার বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি, সেখানে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো সেই অনুষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপন মূল্য নির্ধারণ করে ৩০-৪০ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা। মার্কেটিং বিভাগ পরিচালনা পর্ষদের কাছে বিষয়টি জানালে পরিচালনা পর্ষদ প্রযোজককে আরও কম বাজেটে অনুষ্ঠান নির্মাণের জন্য চাপ দেয়। অগত্যা প্রযোজক বাধ্য হয়ে কম বাজেটের অনুষ্ঠান নির্মাণ করায় মানের আরো অবনতি ঘটে।

কিন্তু টেলিভিশন মালিক বা পরিচালনা পর্ষদ কখনোই চিন্তা করেন না যে, একটি অনুষ্ঠান নির্মাণের পর অন্তত চার থেকে ছয় মাস বা কয়েকটি পর্ব টেলিভিশনে প্রচারের পর অনুষ্ঠানটির দর্শক জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পর সেই অনুষ্ঠানটি যদি মার্কেটিং বিভাগকে বিক্রয়ের জন্য দেয়া যেত তবে সহজেই অনুষ্ঠানটি একটি ভালো মূল্য পেত; যা অনুষ্ঠানের মান ধরে রাখার জন্যও সহায়ক। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত থাকায় সেই সুযোগের ফায়দা লুটছে বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা। দেশিয় পণ্যের বিজ্ঞাপনদাতারা বড় একটা বাজেট দিয়ে থাকে অনলাইন মিডিয়াতে, যা থেকে দেশীয় কিছু অনলাইন ছিটেফোটা পায় আর বেশির ভাগ চলে যায় বিদেশী সাইটগুলোতে। বিজ্ঞাপনী এজেন্সির মতো অনলাইনে নামে-বেনামে কিছু এজেন্সিও গড়ে উঠেছে, যারা ওইসব বিজ্ঞাপন নেয়।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, জনপ্রিয়তা জরিপের পদ্ধতি কী হবে? সেটারও একটা ইউনিফর্ম বা সুষম পদ্ধতি নির্ধারণ ও অবলম্বন প্রয়োজন। টেলিভিশনের মূলমন্ত্র হচ্ছে তিনটি- তথ্য, শিক্ষা, বিনোদন; শুধু বিজ্ঞাপনের নামে যাচ্ছেতাই অনুষ্ঠান চলছে। সেখান থেকে কী তথ্য দিচ্ছি, কী শিক্ষা পাচ্ছি? সেটা ভাবার বিষয়। পরিচালনা পর্ষদ যদি এখনও তৎপর না হয় তাহলে বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যানেলে ক্যানেলে সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসটি যে ভেসে যাবে সেটা ভেবে কবে তৎপর হবে?

বিজ্ঞাপনদাতা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার অশুভ তাৎপরতা:

বিজ্ঞাপন জগতের এই অশুভ আগ্রাসনের পরিণতি কিন্তু ভয়ানক। বিশাল পরিমাণ টাকার বিজ্ঞাপন বিদেশী চ্যানেলে চলে যাচ্ছে। দেশ যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশী চ্যানেল ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। ইদানিং কেবল অপারেটররাও এই ইঁদুর দৌড়ে পিছিয়ে নেই। তারাও দেদারসে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে অনেক কম মূল্য নিয়ে। আবার অনলাইল বিজ্ঞাপনে নামেও অবৈধভাবে পাচার হচ্ছে দেশীয় টাকা, যার কোনো হিসেব নেই, নেই এর কোনো পরিসংখ্যান বা পরিমাণ, সরকার পাচ্ছে না ভ্যাট ট্যাক্স। টিভি চ্যানেলের খরচ তোলা তাই আজ হাতি পোষার মতো। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে আপনারা সবাই জানেন। কোন অতলে সেই রূপালি পর্দার স্বর্ণালি যুগ হারিয়ে গেছে আজ!

টিভি মার্কেটিংয়ের একাল-সেকাল:

মার্কেটিং কৌশল বা স্ট্রাটেজি বানাতে প্রয়োজন লম্বা সময় ধরে ধীরে ধীরে জাল বোনার মতো সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। পুঁথিগত জ্ঞান আর বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে পরিকল্পনা করতে গেলে প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, পণ্যের মানন্নোয়নের প্রচেষ্টা এবং অনুষ্ঠানের মান ও দাম নির্ধারণে যতটা সম্ভব খেয়াল রাখা। কেন মানুষ আমার চ্যানেলটা দেখবে? কেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা আমাকে বিজ্ঞাপন দেবে? এর কোনোটাই একদিনে শেখা যায় না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী আন্তরিক প্রচেষ্টা ও লেগে থাকার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা। এখানে ইচ্ছামতো পরিকল্পনাও করা যাবে না। আপনাকে বুঝতে হবে টার্গেট কোন মানুষগুলি? তাদের বয়স, রুচি ভেদে অনুষ্ঠান বানাতে ও বিক্রি করতে হবে। তাই এ প্রসঙ্গে সম্যক ধারণা প্রয়োজন। কেন দৈন্যের মতো হাত বাড়াতে হবে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে? অর্থাৎ নিজের চ্যানেলকে ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন। আমি যদি নিজের চ্যানেলকে সঠিকভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারি, তাহলে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব।

সত্যি শামসুর রহমানের ভাষায় বলতে চাই ‘‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে স্বদেশ।’’ ইদানিং দেশে নতুন এক শ্রেণির দালাল সম্প্রদায়ভুক্ত বিজ্ঞাপনী সংস্থা ভূঁইফোড়ের মতো গজিয়ে উঠেছে। হলুদ সাংবাদকিতা তো আপনারা শুনেছেন। এদের আমার হলুদ মার্কেটিং দালাল মনে হয়। এরা দেশজ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে বিদেশী বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার করে। শুধু তাই নয়, এরা বাংলাদেশের প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনেও বিদেশী মডেল বা আর্টিস্ট ব্যবহার করে, এমনকি ডাবিংও করে। এমনিতেই বাংলাদেশের টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন যেমন সিংহ ভাগ বিদেশী চ্যানেল যাচ্ছে, তেমনি অনলাইন মিডিয়াও ভাগ বসিয়েছে বিজ্ঞাপনে। দেশের পত্রিকা, ম্যাগাজিন, রেডিও, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, দেশীয় মিডিয়া এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে, বন্ধ হয়ে গেছে অনেক, তার ওপর এই মহামারী আমাদের মিডিয়াকর্মীদের আনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এসব সুবিধাভোগী মানুষ কি ভুলে যাচ্ছে যে, গড়ে দেশের সব চ্যানেলের ওপর মোট প্রায় ৫০ হাজার মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা প্রত্যক্ষভাবে নির্ভর করে? তবে এইসব সুবিধাভোগীরা এবং এমনকি বিজ্ঞাপনী সংস্থাও পরোক্ষভাবে রুটিরুজির জন্য দেশজ চ্যানেলের উপর নির্ভরশীল। এরা এতটাই লোভী যে প্রতিদিন সোনার ডিম না নিয়ে এখনই সোনার ডিম পাড়া হাঁসটাকে বিদেশী ছুরি দিয়ে জবাই করে দিচ্ছে।

দেশি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন-বিপনণ সম্ভাবনা:

‘Good marketing makes the company look smarter, great marketing makes the customer feel smart!’

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে টেলিভিশন মার্কেটিংয়ের পেশাজীবীদের সম্ভাবনা অসীম, কারণ চ্যানেলের জ্বালানি রসদ এদের হাতে। ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এর মার্কেটিং আজ ততটাই এবং ক্ষেত্রবিশেষে তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ও দক্ষ মার্কেটিংয়ের মেরুকরণে নির্দিষ্ট সুষম সমন্বয় না থাকে তবে সেই চ্যানেলে ভারসাম্য বিনষ্ট হবে।

এককভাবে শুধু ভালো অনুষ্ঠান বা শুধু ভালো মার্কেটিং দিয়ে এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। প্রয়োজন সুষম সমন্বয়। মার্কেটিংয়ে দক্ষ মানবশক্তি সৃষ্টিতে যতটুকু ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে তা অপ্রতুল। সাংবাদিকদের নিয়ে আমাদের চ্যানেলগুলোতে যাও-বা ট্রেনিং দেওয়া হয়, মার্কেটিংয়ে তার ছিটেফোঁটাও নেই। এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, সেমিনার ইত্যাদি। কম্পিউটারে আমরা প্রতিনিয়ত যেমন অ্যান্টিভাইরাস আপডেট করি তেমনি প্রয়োজন নিজেকে যুগোপযোগী করতে মার্কেটিং জ্ঞানের বাস্তবমুখী প্রায়োগিক শিক্ষা। অথচ মানন্নোয়নের এই বিষয়টি আজ মার্কেটিং পেশাজীবীদের কর্মক্ষেত্রে ভীষণভাবে অবহেলিত।

সময়ের প্রয়োজনে এখন কিন্তু বিজ্ঞাপন বিরতির যুগ শেষ। আধুনিক মানুষের সময় কমে গেছে টিভির সামনে বসবার। ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, মোবাইল ফোন আর গেমসের জমানায় আপনি কীভাবে আশা করেন আপনার চ্যানেলের সামনে মানুষ বসে থাকবে রিমোট হাতে? এখন দর্শকের সামনে অনেক বিকল্প, তাকে টিভির সামনে ধরে রাখতে হবে আপনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। এখানে চ্যানেলের বিভিন্ন বিভাগগুলোর সম্মিলিত প্রয়াসের ভূমিকা অপরিসীম। তাই টিভিকে বিজ্ঞাপনের আখড়া না বানিয়ে এখন বিকল্প ভাবতে হবে। আমি বলি, “টিভি মার্কেটিং আজ শুধু সেলিং বা কালেকশন না। এটা একটি উদীয়মান শিল্প, কারণ জিও পলিটিকাল লোকেশনের জন্য বাংলাদেশের অসীঁম সম্ভবনার দ্বার উন্মোচন হওয়া সময়ের দাবি।

শত শত ব্র্যান্ডের যে বিজ্ঞাপন ভেসে বেড়াছে চ্যানেলের ক্যানেলে তার প্রচার কি ঠিকঠাক হচ্ছে? অনলাইনের যুগে এটা কি কার্যকরী? দেশের ৩২টি চ্যানলে কোভিডকালীন সময় হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠা গুগোল, ইউটিউব ও ফেসবুকে ভাগ করলে বিজ্ঞাপনের বাজারটা কি ছোট হয়ে যাচ্ছে না? টিভিসির বেলায় কতটুকু যত্নশীল বিজ্ঞাপনদাতারা? আপনার বিজ্ঞাপন কি আসলেই কনজুমার পযন্ত পৌঁছাচ্ছে? ওয়াইফাই আর ডিশের কল্যাণে বিদেশী পণ্যের ভিড়ে আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন আমাদের চ্যানেলগুলোর লাগামহীনতায় ভেসে যাওয়ার রাশ টানার সময় এখনি। আর কতদিন?

এই গ্লোবাল ভিলেজের যুগে, করোনাভাইরাস আমাদের শিখিয়েছে দিল এখনই টেলিভিশন শিল্পকে বাঁচাতে শুধু বিজ্ঞাপন নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প আয়ের উৎস খোঁজা লাইফ সাপোর্টের মতোই জরুরি। ডেভিড ওগলিভির একটা কথা মনে পড়ছে, “The relationship between a manufacturer and his advertising agency is almost as intimate as the relationship between a patient and his doctor. Make sure that you can live happily with your prospective client before you accept his account.”

মোহাম্মাদ আক্তার হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − 6 =

Translate »